screenshot_2020-08-11-newsletter

এ বছর পর শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস এর সপ্তম আসর বসার কথা ছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে পৃথিবীর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। আমাদের সবাইকে বন্দি হতে হল ঘরের ভেতর।

এর আগেই আমরা রেজিস্ট্রেশন শেষ করেছিলাম। সারা দেশে ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো কুদরাত-ই-খুদা সায়েন্স ক্যাম্প করেছিলাম। এছাড়া এক্টিভেশন, মেঘনাদ সাহা বিজ্ঞান ক্যাম্পসহ সবকিছু শেষ হয়ে গেছে ততদিনে। শুধু কংগ্রেসের মূল আয়োজনটি বাকি। মহামারির প্রকোপে কিছুদিন আটকে থাকার পর আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের থেমে থাকা চলবেনা।

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অনলাইনে হবে এবারের কংগ্রেস। সে অনুযায়ী ঘোষণা দেওয়া হল এবং শিক্ষার্থীদের বলা হল তাদের গবেষণা পুরোটা শেষ করে অনলাইনে জমা দিতে। আমরা প্রথমে চিন্তিত ছিলাম কেমন করে হবে সবকিছু, শিক্ষার্থীরা পারবে কিনা অংশ নিতে। কিন্তু যখন আমরা জরিপের জন্য সকল নির্বাচিত শিক্ষার্থীদেরকে ফোন দিলাম, তখন আবিষ্কার করলাম আমাদের চেয়ে অনলাইনে করার জন্য শিক্ষার্থীরা বেশি আগ্রহী। তাই সব জড়তা কেটে ফেলে আমরা পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।

১৭ জুলাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সপ্তমবারের মতো শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস শুরু হয়। এবারের কংগ্রেসে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে প্রায় তেরোশ শিক্ষার্থী ধারণাপত্র জমা দেয়। এদের মধ্যে নির্বাচিতরা সুযোগ পায় অনলাইন কংগ্রেসে অংশগ্রহণের। কংগ্রেসের প্রথম দুইদিন প্রায় পাঁচশ শিক্ষার্থী তাদের গবেষণা উপস্থাপন করে।

আমরা যে সাত বছর ধরে কংগ্রেস আয়োজন করছি, তার একটা ফল আমরা পেতে শুরু করেছি। এবারের কংগ্রেস অন্যরকম শুধু অনলাইনে এত খুদে বিজ্ঞানীদের সফল অংশগ্রহণের ফলেই নয়। আগের কংগ্রেসগুলোর চেয়ে আরো বেশি সায়েন্টিফিক মেথোডোলজি অনুসরণ করে গবেষণা করেছে এবারের অংশগ্রহণকারীরা।

পঞ্চম শ্রেণির তিন খুদে বিজ্ঞানী আরিবা রায়া, মনিসা তাইফ এবং জাহরা রুকাইয়া সমুদ্রে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত। তাই নালন্দা উচ্চবিদ্যালয় পড়ুয়া এই তিন বিজ্ঞানী তাই জানার চেষ্টা করেছে লবণাক্ত মাটিতে বিভিন্ন গাছের জীবনীশক্তি। টবের মাটিতে নিয়মিত লবণ পানি ঢেলে তারা পর্যবেক্ষণ করেছে বিভিন্ন গাছের লবণ সহ্য করার ক্ষমতা।

জামাল নজরুল ইসলাম, এ. আর খান এবং হরিপদ কাপালি এই তিনটি লাউঞ্জে খুদে বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা উপস্থাপন করে। এ.আর খান লাউঞ্জে পোস্টার উপস্থাপন করে জান্নাতুল ফেরদৌস। সে টিকটিকির মলের এন্টিফাংগাল প্রোপার্টিজ এবং এর ব্যবহার নিয়ে একটি মৌলিক গবেষণা করেছে। তার কাজটিকে 'পোস্টার অব দ্য কংগ্রেস' ঘোষণা করা হয়। জামাল নজরুল ইসলাম লাউঞ্জে দেখা মেলে আরো তিনজন বিজ্ঞানী আবরার খান সিয়াম, মুয়াম্বর সারোয়ার নিবির, আবরার তাসনিম আবিরের। তারা এসিড-ক্ষার দ্রবণের টাইট্রেশন নিয়ে কাজ করেছে। সঠিক বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে করা এই গবেষণাটিকে 'পেপার অব দ্য কংগ্রেস' ঘোষণা করা হয়। হরিপদ কাপালি লাউঞ্জে কৃষিউপযোগী পরিবেশ নিয়ে একটি দারুণ প্রজেক্টের দেখা মেলে। তিন বিজ্ঞানী সিদরাতুল হাসিন, সিদরাতুল তুসিন, কাজী আহনাফ সাদ এই প্রজেক্টে গাছের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর পরিমাণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাদের অসাধারণ গবেষণাটিকে 'প্রোজেক্ট অব দ্য কংগ্রেস' ঘোষণা করা হয়। এরকম প্রায় পাঁচশ খুদে বিজ্ঞানীদের মধ্য থেকে ৫২ জনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

কংগ্রেসের দ্বিতীয় দিন কিনোট স্পিচ দেন ড. সাজেদুর রহমান শাওন। তিনি স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তথ্য ভিত্তিক গবেষণার ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে তিনি প্রবন্ধটি উপস্থাপন করছেন। তৃতীয় দিন সকালে ছিল কংগ্রেসের আকর্ষণীয় পর্ব 'যৌথ কংগ্রেস'। যৌথ কংগ্রেসে একইসাথে বিশিষ্ট গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। এবারের যৌথ কংগ্রেসে প্যানেলিস্ট হিসেবে ছিলেন ড. হাসিনা খান, ড. জেবা ইসলাম সেরাজ, ড. আরশাদ মোমেন, ড. এম নুরুজ্জামান খান, ড. ওমর শেহাব, ড. সেঁজুতি সাহাসহ অনেক বিখ্যাত গবেষক। সভাপতিত্বে ছিলেন ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। এসময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গবেষকরা তাদের গবেষণা কীভাবে শুরু করেছেন, কীভাবে বাধা দূর করা যায়, গবেষণায় কী অর্জন করা যায় সেগুলো নিয়ে কথা বলেন।

এরপর শিক্ষার্থীরা নিজেদের গবেষণা, প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মন্তব্য করে। প্যানেলিস্টদের কাছে নানা বিষয় জানতে চায়। প্যানেলিস্টরা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন, সেইসাথে গবেষণায় ভালো করার জন্য পরামর্শ দেন। ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের বলেন, সবার মধ্যেই একজন বিজ্ঞানী থাকে। মনটা বিজ্ঞানী হতে হয়। তিনি হাতে কলমে গবেষণা করতে বলেন। ড. রাগীব হাসান গবেষণার পদ্ধতি ভালোভাবে জানার ব্যাপারে জোর দেন। সদ্য পিএইচডি সম্পন্ন করা তরুণ বিজ্ঞানী সুদীপ্ত কর শিক্ষার্থীদের বেশি বেশি বই পড়তে বলেন। এছাড়া যৌথ কংগ্রেস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সামার ক্যাম্প আয়োজন এবং খুদে বিজ্ঞানীদের ল্যাব সুবিধা বাড়ানোসহ সাতটি প্রস্তাব পাশ করা হয়।

কংগ্রেসের তৃতীয়দিন সন্ধ্যায় খুদে বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী ড. এম জাহিদ হাসান। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে তার গবেষক হিসেবে পথচলা নিয়ে কথা বলেন। খুদে বিজ্ঞানীদের নানান কৌতুহলী প্রশ্নের উত্তর দেন। অনলাইনেও খুদে বিজ্ঞানীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাকে চমৎকৃত করে। তিনি বাংলাদেশের গবেষণা সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এবারের কংগ্রেসে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের একজন শিক্ষার্থী, দিগন্তিকা বোস অংশগ্রহণ করে। সে সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিসে ভোগা রোগীদের জন্য স্মার্ট সার্ভিকাল কলার তৈরি করে। শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস অদূর ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে পরিণত হবে বলে সকলে আশা করে।

কংগ্রেসের বিজয়ীদের নিয়ে ২৫-২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞান ক্যাম্প। সেখানে তিনদিন তারা বিভিন্ন বিজ্ঞানী এবং মেন্টরদের কাছে বিজ্ঞান ও গবেষণার ব্যাপারে বিস্তারিত শিখেছে। এই ক্যাম্পটিও হয়েছে অনলাইনে।

এবছর কয়েকজন খুদে বিজ্ঞানীকে গবেষণায় সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির চিল্ড্রেন্স সায়েন্স ফান্ড থেকে দেয়া হয়েছে রিসার্চ গ্রান্ট। অনুষ্ঠানটির আয়োজক বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি, বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন ও জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর।

আমরা ভয়ে ছিলাম, এ বছর শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। তাই হয়তো অংশ নিতে সমস্যা হবে অনেকেরই। এদের মধ্যে দুই বোনের গল্প না বললেই নয়। তারা দুজনসহ তাদের পরিবারের সকলেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আমাদের মেন্টরদের উৎসাহে তারা থেমে যায়নি। করোনা আক্রান্ত থেকেই কাজ চালিয়ে গেছে তারা। এবং তাদের দুজনের আলাদা দুটি গবেষণা আগে নির্বাচিত হয়ে থাকলেও তারা দেখল, এই অবস্থায় দুজন মিলে একটি মাত্র গবেষণা শেষ করা যায়। তাই তারা দুজন দল বদলে একটি দলে চলে এসে তাদের গবেষণাটি ঠিকঠাক ভাবে শেষ করল। এই ঘটনা আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদেরকে এতই উৎসাহিত করেছে যে সবাই আরো বেশি পরিশ্রম করে কাজ করতে শুরু করলো।

আগে কোন বারই আমরা শিক্ষার্থীদের গবেষণাটি কংগ্রেসের আগে জমা নিতে পারতাম না। কিন্তু এ বছর অনলাইনে হওয়ায় আমরা গবেষণাগুলো আগে জমা নিয়ে নিলাম। এবং এক সপ্তাহ বসে আমাদের বিচারকেরা অংশগ্রহণকারীদের গবেষণাগুলো খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখবার সুযোগ পেলেন।

শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে এবার আমাদের সবচেয়ে বেশিবার মনে পড়বে সদ্যপ্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে। যিনি আমাদের উপদেষ্টা হয়ে সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাকে।

কৃতজ্ঞতা এই আয়োজনের পার্টনারদের প্রতি, যাদের সহযোগিতায় বিজ্ঞানের এই যাত্রা দিনে দিনে আরও ছড়িয়ে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞতা সকল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি, যাদের ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের কারণে এই সংকটের সময়ে এতবড় একটি আয়োজন অনলাইনে করা সম্ভব হচ্ছে।

লেখক—
ওমর ফারুক
অ্যাকাডেমিক কোঅর্ডিনেটর
শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০২০